যৌতুক দাবিতে যে স্টাইলে গৃহবধূকে মধ্যযুগীয় নির্যাতন করল স্বামী

নোয়াখালী প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৯:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ৮৯ বার পড়া হয়েছে
সময়ের সন্ধানে মিডিয়া লিঃ সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ছবি:সংগৃহীত

দরজা বন্ধ করে বেঁধে ফেলা হয় খাটের পায়ার সঙ্গে। চিৎকার বন্ধ করতে ওড়না দিয়ে বাঁধা হয় মুখ। এরপর শুরু হয় মধ্যযুগীয় নির্যাতন। পেটাতে পেটাতে একপর্যায়ে মাটিতে পড়ে গেলে গলা পাড়া দিয়ে চেপে ধরা হয়। নির্যাতনের এ আওয়াজ শুনানো হয় গৃহবধুর পিতাকে। সংবাদ পেয়ে পুলিশের সহযোগতিায় উদ্ধার করা হয় সেই ফারজানা বেগমকে। অনেকটা অজ্ঞান অবস্থায় র্ভতি করা হয় উপজলো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। 

বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে এ ঘটনাটি ঘটে নোয়াখালীর হাতিয়ায় বুড়িরচর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের রেহানিয়া গ্রামে।

উপজলো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মহিলা ওয়ার্ডে ২৪নং বেডে ভর্তি আছেন নির্যাতিতা ফারজানা বেগম। কথা হয় তার সাথে।

লোমর্হষক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ফারজানা আরটিভি নিউজকে বলেন, সাত বছর আগে আবদুল গণির সাথে তার বিয়ে হয়। দুটি পুত্র সন্তান আছে। বিয়ের পর থেকে ধাপে ধাপে বাপের বাড়ি থেকে র্স্বণালংকার নগদ অর্থ ঘর তৈরির জন্য গাছ ও আসবাবপত্র হাড়িপাতিল অনেক কিছু স্বামীকে দেওয়া হয়। কিন্তু তার চাহিদা মেটে না। চাওয়া হয় আরও টাকা; যা বাবার পক্ষে সম্ভব হয় না। বিভিন্ন অজুহাতে আমাকে নির্যাতন করে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এই ফাঁকে আমার স্বামী বাড়ির পাশের তার এক বিধবা মামাতো বোনের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। স্বামীর অনৈতিক কাজে বাঁধা দিলে সে আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে বেদম মারধর করত।

ফারজানা বলেন, ঘটনার দিন আবদুল গণি নৌকা থেকে এসে পাশের বাড়ির মামাতো বোনের বাড়ি চলে যায়। আমি তাতে বাধা দিলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে ইচ্ছেমতো মারধর করে বাজারে চলে যায়। রাতে বাজার থেকে এসে ঘরে ডেকে নিয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগে তার মা-বাবা ভাই ঘরে ঢুকে দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়। পরে আমাকে খাটের সাথে বেঁধে বেদম মারপিট করতে থাকে। একপর্যায়ে আমার বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে নির্যাতনের আওয়াজ মুঠোফোনে শুনানো হয় আমার বাবাকে। এ সময় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে ঘুম ভাঙলে দেখি আমি হাসপাতালে।

এ বিষয়ে ফারজানার পিতা মো. হানিফ বলেন, বিয়ের পর যৌতুকের জন্য নানাভাবে আমার মেয়েকে নির্যাতন করত। মেয়ের শান্তির জন্য বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণ নগদ টাকা ও ঘরের দরকারি জিনিসপত্র পাঠালেও নির্যাতন যেন থামছে না। সে আমার মেয়েকে মারছে আর চিৎকারের আওয়াজ মোবাইল করে আমাকে শোনাচ্ছে। আমি যেন তাদের বাড়ি না যাই, সে জন্য হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয় আমাকে। পরে থানায় অভিযোগ দিলে আমার মেয়েকে এসআই প্রতিক পাল গিয়ে রাত ১০টার সময় উদ্ধার করে হাতিয়া হাসপাতালে ভর্তি করে।

এ বিষয়ে বার বার ফারজানার স্বামীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। কথা হয় পাশবর্তী সূর্যমূখী মাছ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলাউদ্দিনের সাথে।

তিনি বলেন, ফারজানার স্বামীর সাথে পারিবারিক কলহ চলে আসছে অনেক দিন থেকে। শনিবার একটি সালিশ বৈঠকের সময় নির্ধারণ ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে বৃহস্পতিবার রাতে মেয়ের বাবা মোবাইলে করে তার মেয়েকে পেটানো হচ্ছে বলে জানান। এই বিষয়ে তিনি সহযোগিতা চান। কিন্তু অনেক রাত হওয়ায় পারজানার শ্বশুরবাড়ি যাওয়া যায়নি। পরে শুনেছি পুলিশ এসে ফারাজানাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। ফারজানার স্বামী আব্দুল গণি মাছ ধরতে সাগরে চলে যাওয়ায় তার সাথে কথা বলা যায়নি।

হাতিয়া থানার উপপরিদর্শক প্রতিক পাল জানান, গৃহবধূকে নির্যাতন করে ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে, এমন  একটি অভিযোগ থানায় এসেছে। পরে গৃহবধুর শ্বশুরবাড়ি থেকে রাতে তাকে অনেকটা মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়েছে। এ সময় বাড়িতে পুরুষদের কেউ ছিল না। এ বিষয়ে থানায় তারা এখনও লেখিত কোনো অভিযোগ দেয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

যৌতুক দাবিতে যে স্টাইলে গৃহবধূকে মধ্যযুগীয় নির্যাতন করল স্বামী

আপডেট সময় : ০৬:৪৯:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

ছবি:সংগৃহীত

দরজা বন্ধ করে বেঁধে ফেলা হয় খাটের পায়ার সঙ্গে। চিৎকার বন্ধ করতে ওড়না দিয়ে বাঁধা হয় মুখ। এরপর শুরু হয় মধ্যযুগীয় নির্যাতন। পেটাতে পেটাতে একপর্যায়ে মাটিতে পড়ে গেলে গলা পাড়া দিয়ে চেপে ধরা হয়। নির্যাতনের এ আওয়াজ শুনানো হয় গৃহবধুর পিতাকে। সংবাদ পেয়ে পুলিশের সহযোগতিায় উদ্ধার করা হয় সেই ফারজানা বেগমকে। অনেকটা অজ্ঞান অবস্থায় র্ভতি করা হয় উপজলো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। 

বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে এ ঘটনাটি ঘটে নোয়াখালীর হাতিয়ায় বুড়িরচর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের রেহানিয়া গ্রামে।

উপজলো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মহিলা ওয়ার্ডে ২৪নং বেডে ভর্তি আছেন নির্যাতিতা ফারজানা বেগম। কথা হয় তার সাথে।

লোমর্হষক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ফারজানা আরটিভি নিউজকে বলেন, সাত বছর আগে আবদুল গণির সাথে তার বিয়ে হয়। দুটি পুত্র সন্তান আছে। বিয়ের পর থেকে ধাপে ধাপে বাপের বাড়ি থেকে র্স্বণালংকার নগদ অর্থ ঘর তৈরির জন্য গাছ ও আসবাবপত্র হাড়িপাতিল অনেক কিছু স্বামীকে দেওয়া হয়। কিন্তু তার চাহিদা মেটে না। চাওয়া হয় আরও টাকা; যা বাবার পক্ষে সম্ভব হয় না। বিভিন্ন অজুহাতে আমাকে নির্যাতন করে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এই ফাঁকে আমার স্বামী বাড়ির পাশের তার এক বিধবা মামাতো বোনের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। স্বামীর অনৈতিক কাজে বাঁধা দিলে সে আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে বেদম মারধর করত।

ফারজানা বলেন, ঘটনার দিন আবদুল গণি নৌকা থেকে এসে পাশের বাড়ির মামাতো বোনের বাড়ি চলে যায়। আমি তাতে বাধা দিলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে ইচ্ছেমতো মারধর করে বাজারে চলে যায়। রাতে বাজার থেকে এসে ঘরে ডেকে নিয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগে তার মা-বাবা ভাই ঘরে ঢুকে দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়। পরে আমাকে খাটের সাথে বেঁধে বেদম মারপিট করতে থাকে। একপর্যায়ে আমার বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে নির্যাতনের আওয়াজ মুঠোফোনে শুনানো হয় আমার বাবাকে। এ সময় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে ঘুম ভাঙলে দেখি আমি হাসপাতালে।

এ বিষয়ে ফারজানার পিতা মো. হানিফ বলেন, বিয়ের পর যৌতুকের জন্য নানাভাবে আমার মেয়েকে নির্যাতন করত। মেয়ের শান্তির জন্য বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণ নগদ টাকা ও ঘরের দরকারি জিনিসপত্র পাঠালেও নির্যাতন যেন থামছে না। সে আমার মেয়েকে মারছে আর চিৎকারের আওয়াজ মোবাইল করে আমাকে শোনাচ্ছে। আমি যেন তাদের বাড়ি না যাই, সে জন্য হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয় আমাকে। পরে থানায় অভিযোগ দিলে আমার মেয়েকে এসআই প্রতিক পাল গিয়ে রাত ১০টার সময় উদ্ধার করে হাতিয়া হাসপাতালে ভর্তি করে।

এ বিষয়ে বার বার ফারজানার স্বামীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। কথা হয় পাশবর্তী সূর্যমূখী মাছ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলাউদ্দিনের সাথে।

তিনি বলেন, ফারজানার স্বামীর সাথে পারিবারিক কলহ চলে আসছে অনেক দিন থেকে। শনিবার একটি সালিশ বৈঠকের সময় নির্ধারণ ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে বৃহস্পতিবার রাতে মেয়ের বাবা মোবাইলে করে তার মেয়েকে পেটানো হচ্ছে বলে জানান। এই বিষয়ে তিনি সহযোগিতা চান। কিন্তু অনেক রাত হওয়ায় পারজানার শ্বশুরবাড়ি যাওয়া যায়নি। পরে শুনেছি পুলিশ এসে ফারাজানাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। ফারজানার স্বামী আব্দুল গণি মাছ ধরতে সাগরে চলে যাওয়ায় তার সাথে কথা বলা যায়নি।

হাতিয়া থানার উপপরিদর্শক প্রতিক পাল জানান, গৃহবধূকে নির্যাতন করে ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে, এমন  একটি অভিযোগ থানায় এসেছে। পরে গৃহবধুর শ্বশুরবাড়ি থেকে রাতে তাকে অনেকটা মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়েছে। এ সময় বাড়িতে পুরুষদের কেউ ছিল না। এ বিষয়ে থানায় তারা এখনও লেখিত কোনো অভিযোগ দেয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।