টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটক শূন্য, বেকার হাজারও হাউসবোট কর্মী

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৭:২৫:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫ ৬৭ বার পড়া হয়েছে

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":false,"containsFTESticker":false}

সময়ের সন্ধানে মিডিয়া লিঃ সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ছবি: সংগৃহীত

দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র টাঙ্গুয়ার হাওর এখন পর্যটকশূন্য। বর্ষার শুরুতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ে সরব থাকলেও মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে থমকে গেছে পুরো পর্যটন ব্যবসা। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন হাওর-কেন্দ্রিক প্রায় তিন হাজার হাউসবোট শ্রমিক ও চালক, পাশাপাশি বন্ধের পথে পর্যটন-নির্ভর অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওর, নিলাদ্রী লেক, বারেকটিলা ও শিমুল বাগান সহ আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোকে ঘিরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় প্রতি বর্ষায় জমে ওঠে পর্যটন ব্যবসা। ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হাউসবোট, যার সংখ্যা প্রায় ছয় শতাধিক। চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত হাওরে পর্যটকদের চাপ ছিল অন্য বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। আগেভাগে বুকিং না দিলে দ্বিগুণ দামেও পাওয়া যেত না হাউসবোট। তবে আগস্টের পর থেকেই পর্যটকদের আগমন কমতে থাকে।

সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, উপজেলার আনোয়ারপুর, তাহিরপুর সদর বাজার ও মেশিনবাড়ি ঘাটে শত শত হাউসবোট অলস পড়ে আছে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে নৌকা ঘাটগুলোতে গড়ে উঠা দোকানপাটে ব্যবসা কমে গেছে। নিলাদ্রী লেক, বারেকটিলা ও যাদুকাটা নদীর পাড়ে ফুটপাতে থাকা টি-স্টল, ফল, কসমেটিক্স সহ বিভিন্ন জাতের শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকান আর দেখা যায় না। নিলাদ্রী লেকের নৌকা ঘাটের দোকানদার এরশাদ মিয়া, মুক্তার মিয়া সহ অন্যান্যরা দোকান বন্ধ করে অন্য কাজে চলে গেছে বলেও জানা গেছে।

তাহিরপুর সদরের রতনশ্রী গ্রামের জলরাশি লোকাল হাউসবোট চালক রুজেল মিয়া বলেন, এবছর বর্ষার শুরু থেকে তিন মাস অনেক পর্যটক আসছে। ভালো টাকা ইনকাম করছি। আগস্ট মাসের পরেই পর্যটক আসা একেবারে কমে যায়। পর্যটকের আশায় তিন মাস বেকার ছিলাম, কোন কাজ করতে পারিনি। তিন মাসের সঞ্চিত টাকা পারের তিন মাস খরচ করে, বর্তমানে ঋণ করতে হয়েছে। এখন বাধ্য হয়ে হাওরে জাল দিয়ে মাছ ধরে কোন মতে সংসার চালাচ্ছি।

একই গ্রামের সুখের বাড়ি হাউসবোট চালক ইসলাম উদ্দিন বলেন, তিন মাস ধরে হাউসবোট ঘাটে বাধা রয়েছে। কোন আয় রুজি নাই। এখন হাওরে পানি কমতে শুরু করেছে। নিজের কিছু জমি আছে এগুলোতে ধান চাষ করবো। অন্য বছর হাওরে পানি শুকিয়ে গেলে পর্যটক আসা কমে যায় কিন্তু এবছর হাওরে পানি থাকার পরেও পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে গেছে।

হাওরপাড়ের দোকানদারদের অবস্থাও করুণ। নিলাদ্রী লেকপাড়ের দোকানদার এরশাদ মিয়া বলেন, আমার দোকানের পাশে শত শত হাউসবোট আসতো পর্যটক নিয়ে। তিন মাস ধরে কোনো হাউসবোট আসে না, দোকানে বসে সময় কাটানো ছাড়া উপায় নেই। সংসার চালাতে দোকান বন্ধ করে অন্য কাজ ধরেছি।

তাহিরপুর সদর বাজারের দোকানদার রমিজ উদ্দিন বলেন, নৌকা ঘাটে পর্যটক আসায় ছয় মাস ভালো ব্যবসা হত। এবার বর্ষার প্রথমার্ধে ভালো বেচাকেনা হয়েছে। পরে পর্যটক কমে যাওয়ার বেচাকেনা একেবারে কমে যায়।

শিকারা হাউজবোটের মালিক ও হাউজবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক আতাউর ইশতি বলেন, হেমন্ত ছয় মাস হাওর পাড়ের নদী দিয়ে হাউসবোট চলতে পারেনা। তাই ছয় মাস টাঙ্গুয়ার হাওরে এমনিতেই পর্যটক কমে যায়। কিন্তু এবছর ফুল সিজনে পর্যটক আসা কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে একেরপর এক দুর্ঘটনায় রেকর্ড সংখ্যক মানুষের প্রাণ হানি। পর্যটকরা ভয়ে এই রোডে আসতে চায় না। টাঙ্গুয়ার হাওরের আমাদের এসোসিয়েশনের হাউসবোট গুলো ঢাকায় নিয়ে আসছি।

তাহিরপুর নৌ পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ রব্বানী বলেন, হাজারো পরিবার হাউসবোট ও পর্যটন ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তিন মাস পর্যটক না আসায় সবাই ঋণে জর্জরিত। পর্যটকের আশায় সবাই অন্য কোন কাজের সন্ধান না করে বসে বসে দিন পাড় করছে। এখন অনেকেই বিকল্প পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। আমি নিজেও বেকার হয়ে এখন হাওরে মাছ ধরার কাজ করছি।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, ফুল সিজনেও পর্যটক কমে যাওয়ার বিষয়টি আমরা লক্ষ্য করেছি। স্থানীয়দের সচেতন হতে হবে—পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ করা যাবে না। পর্যটন নির্ভর হাজারও মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে সারা বছর পর্যটক আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটক শূন্য, বেকার হাজারও হাউসবোট কর্মী

আপডেট সময় : ০৭:২৫:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫

ছবি: সংগৃহীত

দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র টাঙ্গুয়ার হাওর এখন পর্যটকশূন্য। বর্ষার শুরুতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ে সরব থাকলেও মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে থমকে গেছে পুরো পর্যটন ব্যবসা। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন হাওর-কেন্দ্রিক প্রায় তিন হাজার হাউসবোট শ্রমিক ও চালক, পাশাপাশি বন্ধের পথে পর্যটন-নির্ভর অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওর, নিলাদ্রী লেক, বারেকটিলা ও শিমুল বাগান সহ আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোকে ঘিরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় প্রতি বর্ষায় জমে ওঠে পর্যটন ব্যবসা। ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হাউসবোট, যার সংখ্যা প্রায় ছয় শতাধিক। চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত হাওরে পর্যটকদের চাপ ছিল অন্য বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। আগেভাগে বুকিং না দিলে দ্বিগুণ দামেও পাওয়া যেত না হাউসবোট। তবে আগস্টের পর থেকেই পর্যটকদের আগমন কমতে থাকে।

সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, উপজেলার আনোয়ারপুর, তাহিরপুর সদর বাজার ও মেশিনবাড়ি ঘাটে শত শত হাউসবোট অলস পড়ে আছে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে নৌকা ঘাটগুলোতে গড়ে উঠা দোকানপাটে ব্যবসা কমে গেছে। নিলাদ্রী লেক, বারেকটিলা ও যাদুকাটা নদীর পাড়ে ফুটপাতে থাকা টি-স্টল, ফল, কসমেটিক্স সহ বিভিন্ন জাতের শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকান আর দেখা যায় না। নিলাদ্রী লেকের নৌকা ঘাটের দোকানদার এরশাদ মিয়া, মুক্তার মিয়া সহ অন্যান্যরা দোকান বন্ধ করে অন্য কাজে চলে গেছে বলেও জানা গেছে।

তাহিরপুর সদরের রতনশ্রী গ্রামের জলরাশি লোকাল হাউসবোট চালক রুজেল মিয়া বলেন, এবছর বর্ষার শুরু থেকে তিন মাস অনেক পর্যটক আসছে। ভালো টাকা ইনকাম করছি। আগস্ট মাসের পরেই পর্যটক আসা একেবারে কমে যায়। পর্যটকের আশায় তিন মাস বেকার ছিলাম, কোন কাজ করতে পারিনি। তিন মাসের সঞ্চিত টাকা পারের তিন মাস খরচ করে, বর্তমানে ঋণ করতে হয়েছে। এখন বাধ্য হয়ে হাওরে জাল দিয়ে মাছ ধরে কোন মতে সংসার চালাচ্ছি।

একই গ্রামের সুখের বাড়ি হাউসবোট চালক ইসলাম উদ্দিন বলেন, তিন মাস ধরে হাউসবোট ঘাটে বাধা রয়েছে। কোন আয় রুজি নাই। এখন হাওরে পানি কমতে শুরু করেছে। নিজের কিছু জমি আছে এগুলোতে ধান চাষ করবো। অন্য বছর হাওরে পানি শুকিয়ে গেলে পর্যটক আসা কমে যায় কিন্তু এবছর হাওরে পানি থাকার পরেও পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে গেছে।

হাওরপাড়ের দোকানদারদের অবস্থাও করুণ। নিলাদ্রী লেকপাড়ের দোকানদার এরশাদ মিয়া বলেন, আমার দোকানের পাশে শত শত হাউসবোট আসতো পর্যটক নিয়ে। তিন মাস ধরে কোনো হাউসবোট আসে না, দোকানে বসে সময় কাটানো ছাড়া উপায় নেই। সংসার চালাতে দোকান বন্ধ করে অন্য কাজ ধরেছি।

তাহিরপুর সদর বাজারের দোকানদার রমিজ উদ্দিন বলেন, নৌকা ঘাটে পর্যটক আসায় ছয় মাস ভালো ব্যবসা হত। এবার বর্ষার প্রথমার্ধে ভালো বেচাকেনা হয়েছে। পরে পর্যটক কমে যাওয়ার বেচাকেনা একেবারে কমে যায়।

শিকারা হাউজবোটের মালিক ও হাউজবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক আতাউর ইশতি বলেন, হেমন্ত ছয় মাস হাওর পাড়ের নদী দিয়ে হাউসবোট চলতে পারেনা। তাই ছয় মাস টাঙ্গুয়ার হাওরে এমনিতেই পর্যটক কমে যায়। কিন্তু এবছর ফুল সিজনে পর্যটক আসা কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে একেরপর এক দুর্ঘটনায় রেকর্ড সংখ্যক মানুষের প্রাণ হানি। পর্যটকরা ভয়ে এই রোডে আসতে চায় না। টাঙ্গুয়ার হাওরের আমাদের এসোসিয়েশনের হাউসবোট গুলো ঢাকায় নিয়ে আসছি।

তাহিরপুর নৌ পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ রব্বানী বলেন, হাজারো পরিবার হাউসবোট ও পর্যটন ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তিন মাস পর্যটক না আসায় সবাই ঋণে জর্জরিত। পর্যটকের আশায় সবাই অন্য কোন কাজের সন্ধান না করে বসে বসে দিন পাড় করছে। এখন অনেকেই বিকল্প পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। আমি নিজেও বেকার হয়ে এখন হাওরে মাছ ধরার কাজ করছি।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, ফুল সিজনেও পর্যটক কমে যাওয়ার বিষয়টি আমরা লক্ষ্য করেছি। স্থানীয়দের সচেতন হতে হবে—পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ করা যাবে না। পর্যটন নির্ভর হাজারও মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রাখতে সারা বছর পর্যটক আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।